নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন পরিণত হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ কেন্দ্রস্থলে। খোদ হাসপাতালের প্রধান ও অভিভাবক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. আসাদুজ্জামান আসাদের বিরুদ্ধেই উঠেছে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য ও দায়িত্বে অবহেলার গুরুতর অভিযোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব পালনের চেয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে অপারেশন করাই ডা. আসাদের মূল ব্যস্ততা। কর্মঘণ্টায় হাসপাতালের পরিবর্তে বাইরের ক্লিনিকে সময় কাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য থাকায় সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবাদ করলেই রোগী ও স্বজনদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হাসপাতালের রোগীদের খাবার (ডায়েট) বরাদ্দে চলছে সংগঠিত জালিয়াতি। সরকারি অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে সাদা কাগজে ভুয়া রোগীর নাম লিখে ডায়েট বিল তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি পুরুষ ওয়ার্ডে মাত্র একজন রোগী ভর্তি থাকলেও নথিপত্রে ২০ জন রোগীর খাবারের বিল উত্তোলনের মতো চাঞ্চল্যকর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিদিনের ভর্তি ও ডিসচার্জ রেজিস্টার এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ মিলিয়ে দেখলেই এই তথাকথিত ‘ভূতুড়ে রোগী’র রহস্য সহজেই উদ্ঘাটন হবে।
ডা. আসাদের দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না হাসপাতালের কর্মচারীরাও। একাধিক নারী কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুর করতে মোটা অঙ্কের নগদ অর্থ ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানা অজুহাতে ছুটি আটকে রেখে মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভুক্তভোগীরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
হাসপাতালজুড়ে দালাল চক্রের অবাধ বিচরণ রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও স্বজনরা প্রতিনিয়ত দালালদের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই দালাল চক্রের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরোক্ষ যোগসাজশ রয়েছে।
এছাড়া ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা ও উপহার নেওয়ার বিনিময়ে রোগীদের নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতালের সিসি ক্যামেরা, ভর্তি-ডিসচার্জ রেজিস্টার, ডায়েট বিলের ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করলেই এই দুর্নীতির প্রমাণ স্পষ্ট হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এই দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভাঙতে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন বাঘাবাসী। তাঁদের মতে, তদন্ত ছাড়াই এসব অভিযোগ ধামাচাপা দিলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ডা. আসাদুজ্জামান আসাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম বলেন,“অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”