নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী জেলার পুঠিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র আল মামুন খান, সহকারী প্রকৌশলী ও (ভারপ্রাপ্ত) পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাইদ শহিদুল আলম এবং হিসাব রক্ষক মাসুদ রানার বিরুদ্ধে আনা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হলেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন ও সন্দেহ দানা বাঁধছে।
পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পুঠিয়া পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোঃ শফিকুল ইসলাম কর্তৃক দাখিল করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই বিষয়টি প্রথম জেলা প্রশাসনের নজরে আসে। অভিযোগে পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) ও নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া পিআইসি গঠন, কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ গত ২০২৪ সালের (১৮ জুলাই) জারি করা এক স্মারকে পুঠিয়া পৌরসভার মেয়র মোঃ আল মামুন খান এবং ভারপ্রাপ্ত পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাইদ মোঃ শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে আনা ১৪টি গুরুতর অভিযোগ সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয়। অভিযোগে পৌরসভার উন্নয়ন (এডিপি) তহবিল ও নিজস্ব রাজস্ব তহবিলের অর্থ পিআইসি গঠন, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং কাগুজে কাজ দেখিয়ে আত্মসাৎ করার কথা উল্লেখ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০২৫ সালের (২৮) জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি পত্র প্রেরণ করা হয়।
ওই পত্রের আলোকে স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনায় পরিচালিত সরকারি তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক মেয়র মোঃ আল মামুন খান, সহকারী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাইদ মোঃ শহিদুল আলম এবং হিসাব রক্ষক মোঃ মাসুদ রানার বিরুদ্ধে পৌরসভার এডিপি ও নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে পিআইসি’র নামে অর্থ আত্মসাৎ, কাজ না করেই বিল উত্তোলন, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি ও হিসাব জালিয়াতিসহ মোট ১৪টি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে স্থানীয় সরকার বিভাগ বিধি মোতাবেক গত ২০২৫ সালের (২৭ এপ্রিল) জারি করা এক সরকারি স্মারকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য, সরকারি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার প্রায় এক বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্তদের কাউকে বরখাস্ত করা হয়নি, কোনো বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়নি এবং কোনো ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা হয়নি।
পৌরসভা ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, অভিযুক্তদের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাববলয় রয়েছে। সেই ক্ষমতার নেটওয়ার্কের কারণেই তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে সময়ক্ষেপণ করছে, যাতে ধীরে ধীরে ঘটনাটি জনদৃষ্টির আড়ালে চলে যায় এবং পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া যায়।
সরকারি তদন্তের ফল প্রকাশের পরও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুঠিয়া পৌরসভার সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্প ও রাজস্ব তহবিল আরও বেশি দুর্নীতি ও লুটপাটের ঝুঁকিতে পড়বে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় সচেতন নাগরিক বলেন, সরকারি তদন্তে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি কোনো শাস্তি না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কোথায়?
এদিকে সরকারি নির্দেশনা জারি থাকা সত্ত্বেও কেন এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এই প্রশ্ন এখন স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার বিভাগ পর্যন্ত সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের নীরবতায় জনমনে তৈরি হয়েছে গভীর সন্দেহ, আদৌ এই দুর্নীতির ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না। স্থানীয়দের জোর দাবি, অবিলম্বে তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং পুরো বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের নজরদারিতে আনা হোক।
অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাইদ মোঃ শহিদুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
যোগাযোগ করা হলে হিসাব রক্ষক মাসুদ রানার মুঠোফোন একাধিকবার যোগাযোগ করা তিনি সরকারি তদন্তকে মিথ্যা দাবি করে বলেন তিনি এ ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন না।
সাবেক মেয়র আল মামুন খানের মুঠোফোন একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।